Card image cap

অ্যালামনাই নেটওয়ার্কঃ অ্যালামনাই, ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমিক কোলাবোরেশনের অফিশিয়াল মাধ্যম

একজন শিক্ষার্থীর স্মৃতি যখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে বিশেষভাবে জড়িয়ে যায় সেটি শিক্ষার্থী আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই পক্ষের জন্যই আবেগের ঘটনা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই স্মৃতিকাতরতা তো আরও বেশি। সম্ভবত একসাথে থাকা, খাওয়া, পড়াশুনা করা, ছাত্রজীবনের সেরা সময়গুলো একত্রে কাটানোর ঘটনাগুলো মানুষ কখনোই ভুলতে পারে না। তাই তো প্রতিষ্ঠিত হবার পরেও মানুষ বার বার ফিরে যায় নিজের ক্যাম্পাসে। স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করে, কখনো ব্যাচমেট বা জুনিয়রদের সাথে কাটিয়ে আসে মধুর কিছু মুহূর্ত। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা এই সিনিয়র ব্যাচরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখে, দুখে, উৎসবে, আয়োজনে এই অ্যালামনাইরাই বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে, কখনো পালন করে শুভাকাঙ্ক্ষীর ভূমিকা। কিন্তু এই যে ভালোবাসার বন্ধন, এটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে স্মৃতিচারণ বা রোমান্টিসিজমেই সীমাবদ্ধ না। এর বৃহত্তর প্রয়োগ ও প্রভাব আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা এই ব্যাচমেট, সিনিয়র, জুনিয়র, এমনকি শিক্ষক শিক্ষার্থী পর্যায়ে অনেক সম্পর্ক হয় সবার। পাশ করে বেরুনোর পর তারা একেক জন একেক রকম পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করে। এই পেশাগত জায়গাগুলোতে তারা তখন নিজেদের মধ্যকার এই সম্পর্কগুলোকে নানানভাবে কাজে লাগাতে পারে। এতে যেমন সরাসরি নিজেদের পেশাগত উপকার হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকার হয় তেমনি সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধন জোড়ালো হয়। আসুন দেখে নেওয়া যাক কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই পেশাগত ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিক কোলাবোরেশন সৃষ্টি করে।

ইন্ডাস্ট্রিতে সুযোগদানে অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে কেউ ব্যাংকে যোগ দেয়। কেউ মার্কেটিং এ যায়। কেউ বা হয় গবেষক বা অন্যকিছু। পেশা যাই থাক না কেন তা নিশ্চয়ই কোন না কোন খাতের মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ প্রতিটি পেশারই নিজস্ব ইন্ডাস্ট্রি আছে। এসব ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশগম্যতা চাকরি জীবনের শুরুতেই সহজ নয়। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে তবে না হয় ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো একটা পজিশন পাওয়া যায়। কিন্ত আপনার বড় ভাই বা সিনিয়র কেউ আগে থেকেই ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত থাকলে আপনার মেধার যোগ্য মূল্যায়ন হবার সুযোগ বেড়ে যায়। কিন্তু আপনি কী করে জানবেন আপনার কোন সিনিয়র কোন ইন্ডাস্ট্রিতে আছে? দেখা যাবে ঠিক আপনার মাথার উপরই আপনার কোন ক্ষমতাধর সিনিয়র বসে আছেন কিন্তু তথ্যের অভাবে আপনি জানেন না তিনি আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই। আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক থাকা খুব জরুরি।

ইন্ডাস্ট্রি পরিচালনায়

শুধু যে চাকরি প্রার্থী নতুনদের জন্য অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের প্রয়োজন তা কিন্ত নয়। আপনি চাকরি পাওয়ার পর অথবা বিশেষ করে আপনি যদি উদ্যোক্তা হয়ে থাকেন আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন আপনার কাঁচামাল সরবরাহকারী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্তাদের সাহচার্যে আপনার ইন্ডাস্ট্রি যেন লাভের মুখ দেখে। এসব লবিং ও এক্সিকিউশনের জায়গাগুলোতে লবিং ও ফেস ভ্যালু খুব গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি তো এটাই যে বৈধ কোন কাজ করতে গেলেও আজকাল লবিং এর প্রয়োজন আছে। সেক্ষেত্রে আপনি কেন আপনার বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাইদের সাহায্য নিবেন না? আপনি অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক থেকে সহজেই বের করতে পারেন আপনার ইন্ডাস্ট্রি সংশ্লিষ্ট কে কে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে। অথবা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ে কে আছে যে আপনাকে উপকার করতে পারে। এসব কাজে অ্যালামনাই নেটওয়ার্কিং এর চেয়ে ভাল বিকল্প আর নেই।

লোকবল ও চাকরি খুঁজে দিতে অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক

বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বের হওয়া উদ্যোক্তাদের জন্য লোকবল সংগ্রহ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে এমন একটি দেশ যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার কিন্তু দক্ষ জনবলের বড়ই অভাব। তাই লোকবল সমস্যা সব উদ্যোক্তা আর সব ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রেই একটি প্রকট সমস্যা। কিন্তু আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র বা আপনার ব্যাচমেটদের মধ্যেই অনেকে থাকতে পারে আপনার ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে দক্ষ কিন্তু আপনি তাকে চেনেন না। অন্যদিকে সে হয়তো কাজ না পেয়ে বেকার বসে আছে। আপনারা দুজন যদি অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে জড়িত থাকেন তবে আপনি সহজেই তার কাছে পৌঁছুতে পারবেন। আর সে আপনার ইন্ডাস্ট্রির সম্প্রসারণে মুনাফা বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে। যাকে আজকাল বলে কিনা উইন উইন সিচুয়েশন! তাহলে অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করে আপনি কেন এই সু্যোগ হারাবেন?

ইন্ডাস্ট্রি গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই

বর্তমান পৃথিবীতে আর আগের মত যুদ্ধ হয় না, কোম্পানির মধ্যে হাতাহাতি মারামারি হয় না। যুদ্ধ হয় তথ্য নিয়ে। যে যত জানে সে আজকের পৃথিবীতে তত শক্তিশালী। ধরা যাক আপনি বর্তমানে তৈরি পোষাক শিল্প খাতে কর্মরত আছেন। আপনার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দীরা তখনই আপনার কাছে পরাজিত হবে যখন আপনার কাছে তাদের চেয়ে বেশি তথ্য আছে। আপনি যদি জানেন কাঁচামাল কোথায় সবচেয়ে কমমূল্যে পাওয়া যায় তখন আপনি তার চেয়েও কম মূল্যে বাজারে পোষাক সরবরাহ করতে পারবেন। ফলে বাজার আপনার করায়ত্ত হয়ে যাবে। এই সাধারণ বিষয়টিই আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। এবং এটি যে কেবল ব্যবসার ক্ষেত্রেই হয় এবং চাকরির ক্ষেত্রে নয় তা কিন্তু না। এভাবে তথ্য সংগ্রহ, নতুন স্ট্র্যাটেজি তৈরি, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে দরকার গবেষণা, যার মধ্য দিয়ে আপনার ইন্ডাস্ট্রি আরও ফুলে ফেঁপে উঠবে।
কিন্তু আপনার ইন্ডাস্ট্রির জন্য দক্ষ গবেষক, বাজার বিশ্লেষক আপনি কোথায় পাবেন? সেক্ষেত্রে উত্তর হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ই যেকোন দেশের গবেষণার মন্দির। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে আপনার প্রয়োজনীয় গবেষক, যে আপনার ইন্ডাস্ট্রিকে এনে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। আর এটি সম্ভব হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার মাধ্যমে।

নেটওয়ার্কিং তৈরি করতে অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক

ইন্ডাস্ট্রিসহ নানান ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কিং এর প্রয়োজন অনেক বিশাল। বাজার সম্প্রসারণ, রাজনৈতিক অবস্থান, সুরক্ষা, বন্ধুত্ব রক্ষা – সব কাজেই ইন্ডাস্ট্রির জন্য নেটওয়ার্কিং এর প্রয়োজন আছে। এটি বহুবিধ হতে পারে। পৃথিবীর যেকোন ইন্ডাস্ট্রির কথাই বলা হোক না কেন, সেখানে দক্ষ ও শিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। আর এই শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখার বিকল্প নেই। তাই একাডেমিক নেটওয়ার্ক জরুরি। এভাবে বাজার বিষয়ে জ্ঞান রাখতে মার্কেটিং নেটওয়ার্ক, ইন্ডাস্ট্রির নতুন আইন বা শুল্ক – কর বিধির জন্য আইনি নেটওয়ার্ক – ইত্যাদি অনেক রকম নেটওয়ার্কের প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট বা একজন চাকরিজীবী হিসেবে এতরকম নেটওয়ার্কের হালনাগাদ তথ্য ও দক্ষ জনবল আপনি কোথায় পাবেন?
মজার ব্যাপার হল যে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে একটি মেলার মত। এখানে যেহেতু হরেক রকম ডিপার্টমেন্টের হরেক রকম পেশাজীবী অ্যালামনাই আছে সেহেতু আপনি সহজেই তাদের মাধ্যমে নানাবিধ নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে পারবেন। তাই ইন্ডাস্ট্রিই হোক বা চাকরি অথাব নতুন কোন উদ্যোগ, আপনার নেটওয়ার্কিং বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এসব আলোচনায় একটা জিনিস আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে এখানে তিনটা পক্ষের চমৎকার মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে ইন্ডাস্ট্রিগুলো নানাবিধ সুযোগ পাচ্ছে অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক থেকে। অ্যালামনাইরা কখনো সার্ভিস দিয়ে, কখনো বা সার্ভিস নিয়ে লাভবান হচ্ছেন। আর এদিকে উঠতি পেশাদার শিক্ষার্থীরা কখনো ফুলটাইম, কখনো বা পার্টটাইম চাকরি করে লাভবান হচ্ছেন বা গবেষক হচ্ছেন। এখানে তিন পক্ষ অর্থাৎ অ্যালামনাই, ইন্ডাস্ট্রি আর শিক্ষার্থী সবাই লাভবান। যার ভিত্তি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই নেটওয়ার্কই হতে পারে অ্যালামনাই, ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমিক কোলাবোরেশনের অফিশিয়াল মাধ্যম যার মধ্যে দিয়ে লাভবান হবে সবাই।

About Graduate Network

Graduate Network is the vision of some influential alumni, scholars, community leaders from different alumni associations, universities, & organizations for them and for you.