Card image cap

বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং এ অ্যালামনাইদের ভূমিকা

একটি বিশ্ববিদ্যালয় যে সে প্রতিষ্ঠান নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল এজন্যেই গুরুত্বপূর্ণ না যে এটি আপনার উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারের প্রধান দ্বার, বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েই বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম বাড়ে আবার এর উপর নির্ভর করে আপনার সম্মান ও ভবিষ্যৎ। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে যেগুলো বিশ্ব র‍্যাংকিং এ স্থান পায়। সত্যি বলতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি আমরা র‍্যাংকিং এ। সে কারণেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে র‍্যাংকিং এর মধ্যে নিয়ে আসার তাগিদটা তাই আমাদের আরও বেশি হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি দিতে ও একে র‍্যাংকিং এর মধ্যে নিয়ে আসতে অ্যালামনাইরা অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে। সারা পৃথিবীতেই এভাবে অ্যালামনাইরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং অর্জন করতে বড় ভূমিকা পালন করেন।

কারা অ্যালামনাই

মোটা দাগে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা আমাদের অগ্রজ, যাদেরকে আমরা বড় ভাই বা বোন বলি তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই। অর্থাৎ একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা পাশ করে বেড়িয়েছেন তারা সবাই অ্যালামনাই। স্বভাবতই, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের তুলনায় অ্যালামনাইদের সংখ্যা বেশি হবে। তাই সংখ্যার দিক থেকে অ্যালামনাইদের এক বিশাল ভূমিকা আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যদিকে অ্যালামনাইরা দেশে ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আছেন। আর ঠিক এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং এর ক্ষেত্রে অ্যালামনাইরা বড় ভূমিকা আছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অ্যালামনাইরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেলা সমিতি, ক্লাব ও সামাজিক মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত থাকেন।

অ্যাকাডেমিক খ্যাতিতে অ্যালামনাইদের ভূমিকা

অ্যাকাডেমিক খ্যাতি বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং এর সবচেয়ে বড় সূচক। একটি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে সুনাম ও সম্মান অর্জন করতে না পারলে তার বৈশ্বিক র‍্যাংকিং এ আসার কোন সম্ভাবনা নেই। এখন তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি আর সম্মান বাড়ে কীসে? বিশাল বড় বড় ভবন থাকলে সুনাম বাড়ে নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বাড়লে সুনাম বাড়ে?
সবচেয়ে সহজ উত্তর হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় বৃক্ষের ফল হল তার ছাত্ররা। ছাত্ররা যদি বেশি বেশি সফল হন, তবে আমরা সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মানীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলি। কিন্তু ছাত্রাবস্থায় একজন মানুষ কতটুকুই বা সফল হন! তাই সফলতা বলতে মূলত সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হওয়া শিক্ষার্থী অর্থাৎ অ্যালামনাইদের বুঝায়। অ্যালামনাইদের খ্যাতি আর প্রতিপত্তিই বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি তাই অ্যাকাডেমিক খ্যাতি অর্জনে অ্যালামনাইদের ভূমিকা অনেক বড়।

অবকাঠামো, বরাদ্দ ও উন্নয়ন

কেবল ভাল শিক্ষার্থীই নয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয় এর উন্নত হতে হলে ভাল শিক্ষার পরিবেশ দরকার, পরিচর্যা দরকার। আর সেই কাজে পরোক্ষভাবে মুখ্য ভূমিকা রাখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা অনেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, কেউ কেউ বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন। কেউ থাকেন বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তারা সকলে যখন একত্রিত থাকেন, জোটবদ্ধ থাকেন তখন তাদের চেষ্টায় সরকারও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নজর দেয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ বাড়ে, অবকাঠামোর উন্নতি হয়, গবেষণা বাড়ে। এছাড়া তাদের মাধ্যমে ছাত্রদের বৃত্তি ও নানাবিধ সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হয়। তারা অনুজদের চাকরি দেয়, পরামর্শ দেয়, গবেষণা সহয়তা দেয়। আর এসব কিছু মিলে বৈশ্বিক র‍্যাংকিং এ বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যেকোন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে কেন এই বিশ্ববিদ্যালয় গুলো সমধিক পরিচিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে যে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নানান ক্ষেত্রে সফল। দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তারা কোন কাজে সফল হলে তাতে বিশ্ববিদ্যালয়েরই সুনাম বাড়ে। অন্যদিকে, কেবল নিজের সফলতার ক্ষেত্রেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিচিত করান না, তারা বিভিন্ন প্লাটফর্মেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেন। ধরা যাক, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ ইউনুসের কথা। যখন আন্তর্জাতিক কোন প্লাটফর্মে কেউ ড. ইউনুসের বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জানতে পারে, তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরই সুনাম বাড়ে। এছাড়া সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়গুলোতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যখন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলে, জেলা সমিতি বা ক্লাবগুলোর সাথে তারা যখন বড় ইভেন্ট আয়োজন করে এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি বাড়ে। র‍্যাংকিং এর ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কাগজে কলমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতির জন্য কোন নম্বর বরাদ্দ না থাকলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি বিচারকদের বিচারকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে।

গবেষণা খাতে অ্যালামনাইদের ভূমিকা

সারা বিশ্বে ডক্টরাল বা পোস্ট ডক্টরাল গবেষণাগুলোকে সমীহের চোখে দেখা হয়। কেননা, ডক্টরাল গবেষণাগুলোই কেবল জ্ঞানের ভান্ডারে নতুন জ্ঞান যুক্ত করতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সম্পন্ন গবেষণা বলতে থিসিস বা এম.ফিল নয়, ডক্টরাল গবেষণাকেই বোঝানো হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অ্যাকাডেমিক পড়াশুনার বাইরে কতটুকু গবেষণা করতে পারে? আর অ্যাকাডেমিক পড়াশুনা করার সময় ডক্টরাল গবেষণা করাও তো সম্ভব না। মূলত পড়াশুনা শেষ করা বিশেষজ্ঞদের হাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা গবেষণাগুলো হয়। আর তারাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই। এছাড়া গবেষণা বরাদ্দ দান, গবেষণার জন্য বৃত্তি দেওয়া, কারিগরি সহয়তা দেবার ক্ষেত্রে অ্যালামনাইরা বড় ভূমিকা পালন করেন। অ্যালামনাইরা অনেকে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন। তারাও সাহায্য করেন এই কাজে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি পদে থাকায় তারা গবেষণার তথ্য ও উপাত্ত দিয়েও সাহায্য করেন।
মানসম্মত এসব গবেষণাকেই পরে বহির্বিশ্বের নানান দেশে গবেষণা পত্রে ও বইতে সাইটেশন করা হয়। বিভিন্ন গবেষণা বা উন্নয়ন প্রকল্পেও এসব গবেষণা কাজে লাগে ফলে সাইটেশন বাড়ে। যেহেতু গবেষণা পত্রের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটিও অতোপ্রোতভাবে জড়িত তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও সেখানে সাইটেশন হয়ে যায়। আর গবেষণা সাইটেশন বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং এর একটি বড় সূচক। অ্যালামনাইরা গবেষণা কাজে সহয়তা করার ফলেই এই সাইটেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং এ এগিয়ে থাকে।

আন্তর্জাতিক ছাত্রত্বের অনুপাত

বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং এর আরেকটি বড় সূচক সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রের সংখ্যা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক বা বাইরে থেকে আগত ছাত্রের সংখ্যা বেশি, সে বিশ্ববিদ্যালয় তত উন্নত বলে মনে করা হয়। এখন তাহলে দেখার বিষয় কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার আন্তর্জাতিক ছাত্রত্বের সংখ্যা বাড়াবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কোন পণ্য নয় যে শুধু এর বিজ্ঞাপন দিলেই ছাত্ররা এখানে পড়তে চলে আসবে। বাইরের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার আগে অবশ্যই জেনে নিবে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ার পর সম্ভাবনা কী। আর তখনই সে যাচাই করবে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এর সদস্যরা কে কী পদে আছে বা কতটুকু সফল হয়েছে জীবনে। তাই একথা বলাই যায় যে অ্যালামনাইদের সাফল্যের উপরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করে অনেকাংশে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এর যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন তারা সেখানে ছাত্র ছাত্রীদের রেফারেন্স দিতে পারেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার জন্য। বিজ্ঞাপনে নয় বরং নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক ছাত্রত্বের অনুপাত বাড়ানোর ক্ষেত্রে অ্যালামনাই এর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এসব বিষয়ে দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং এর প্রতিটি সূচকেই অ্যালামনাই সেই সূচককে উন্নত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সূচকগুলো উন্নয়নের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই কতটা সক্রিয় ও শক্তিশালী তা সরাসরি যাচাই করে দেখে অনেক র‍্যাংকিং প্রতিষ্ঠান। সেক্ষেত্রে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই বেশি শক্তিশালী সে বিশ্ববিদ্যালয় নম্বর বেশি পায় এবং র‍্যাংকিং এ এগিয়ে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এর মানে এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্ররা স্মৃতির উদ্দেশ্যে অ্যালামনাই সৃষ্টি করে। বরং এই অ্যালামনাই এর গুরুত্বপূর্ণ নানাবিধ কাজ আছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং এর অনেকাংশও নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই এর উপর। তাই দেশ ও দেশের বাইরে সবাইকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শক্তিশালী ও সক্রিয় অ্যালামনাই গড়ে তোলা উচিত।

About Graduate Network

Graduate Network is the vision of some influential alumni, scholars, community leaders from different alumni associations, universities, & organizations for them and for you.